পবিত্র কোরআন নাজিলের শুরু — এক মহামহিমান্বিত মুহূর্ত
পবিত্র কোরআন নাজিলের শুরু — এক মহামহিমান্বিত মুহূর্ত
আলহামদুলিল্লাহ! তূর পাহাড় কিংবা হেরা গুহার মতো নূরের চূড়ায় দাঁড়ালে যে মরমি অনুভূতি আসে—সেটা মানুষের হৃদয়কে অন্য রকম এক আলোয় ভরিয়ে দেয়। আজ সেই বরকতময় ওহির সূচনা নিয়ে বিস্তারিত ইতিহাস।
১️) ওহি নাজিলের প্রাক-পর্ব: নবীজি (সঃ)-এর প্রস্তুতি
ওহি নাজিলের আগের সময়টায় নবীজি (সঃ) ছিলেন—
অত্যন্ত সত্যবাদী
ন্যায়পরায়ণ
চিন্তাশীল
সমাজের অধঃপতনে গভীরভাবে ব্যথিত
মানবতার কল্যাণের জন্য তিনি একাকীত্বকে ভালোবাসতেন। তাই তিনি প্রায়ই হেরা গুহায় অবস্থান করতেন। সেখানে তিনি রাতের পর রাত ইবাদত, চিন্তা ও মুনাজাতে কাটাতেন।
2️⃣ প্রথম ওহি নাজিল: জিব্রাইল (আ:)–এর আগমন
একদিন, রমজান মাসের শেষ দিকের এক রজনীতে—নবীজি (সঃ) হেরা গুহায় একাকী অবস্থায় থাকার সময় হঠাৎ এক পরশময় উপস্থিতি অনুভব করেন।
হঠাৎই ফেরেশতা জিব্রাইল (আ.) তাঁর সামনে অবতীর্ণ হন।
তিনি নবীজিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেন এবং বলেন—
"اِقْرَأْ"
“পড়ো!”
নবীজি (সঃ) বিনীতভাবে বললেন—
“আমি কীভাবে পড়ব?”
জিব্রাইল (আ.) পরপর তিনবার একইভাবে ধরে বললেন—
"اِقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ"
“পড়ো তোমার সেই প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।”
এভাবেই সূরা আলাক-এর প্রথম পাঁচ আয়াত নাজিল হয়। এটাই ছিল কোরআনের প্রথম ওহি।
3️⃣ নবীজি (সঃ)-এর ভয় ও কম্পন — মহান দায়িত্বের প্রথম অনুভূতি
প্রথম ওহির পর নবীজি (সঃ) ভীত ও বিস্মিত হয়ে যান।
হঠাৎ এমন ঘটনার প্রভাব তাঁর হৃদয়কে নাড়া দেয়।
বাইরে বের হয়ে তিনি দ্রুত তাঁর বাড়িতে ফিরে আসেন—
শরীর কাঁপছিল, শ্বাস দ্রুত চলছিল।
তিনি বললেন—
“জাম্মিলূনী, জাম্মিলূনী!”
“আমাকে ঢেকে দাও, আমাকে ঢেকে দাও!”
4️⃣ মা খাদিজাতুল কুবরা (রাঃ)-এর সান্ত্বনা ও দৃঢ় সমর্থন
মা খাদিজা (রাঃ) ছিলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি নবীজি (সঃ)-এর এই মহান অবস্থান বুঝতে পারেন — এবং তাঁকে সর্বপ্রথম সান্ত্বনা দেন।
তিনি অত্যন্ত ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা নিয়ে বললেন—
"আল্লাহ আপনাকে কখনও অপমান করবেন না।
আপনি সত্যবাদী, আমানতদার, আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করেন, গরিব-মিসকিনকে সাহায্য করেন, অতিথিকে আপ্যায়ন করেন, এবং ন্যায়নীতির পক্ষে দাঁড়ান।"
এটাই ছিল নবীজির আত্মবিশ্বাসের প্রথম পুনরুজ্জীবন।
5️⃣ ওয়ারাকা ইবন নওফেলের কাছে যাওয়া
খাদিজা (রাঃ) নবীজিকে নিয়ে তাঁর চাচাতো ভাই ওয়ারাকা ইবনে নওফেলের কাছে যান।
তিনি ছিলেন আহলে-কিতাবের আলেম।
সব শুনে তিনি বললেন—
“এই ওহি সেই ওহি, যা মুসা (আঃ)-এর নিকট নাজিল হয়েছিল।
আপনি আল্লাহর রাসূল। কিন্তু জানবেন—
আপনার ওপর অত্যাচার আসবে, আপনাকে দেশ থেকে বের করে দেওয়া হবে।”
নবীজি (সঃ) অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন—
“মানুষ কি আমাকে দেশ থেকে বের করে দেবে?”
ওয়ারাকা বললেন—
“হ্যাঁ, যে কেউ সত্য নিয়ে আসে, তার শত্রু তৈরি হয়।”
6️⃣ ওহির ধাপে ধাপে নাজিল ও নবুয়তের পূর্ণতা
প্রথম ওহির পরে কিছুদিন ওহি বন্ধ ছিল — একে বলে ফাতরাতুল ওহি।
এরপর আবার ওহি নাজিল হলো—
সূরা মুদ্দাসসিরঃ “হে চাদরে মোড়ানো ব্যক্তি! উঠুন এবং সতর্ক করুন।”
এভাবেই নবুয়তের দায়িত্ব শুরু হয়।
ধীরে ধীরে ২৩ বছরের মধ্যে কোরআন সম্পূর্ণরূপে নাজিল হয়।
উপসংহার: আলোকময় যাত্রার সূচনা
তূর পাহাড়, হেরা গুহা বা ওহির স্মৃতি বিজড়িত যেকোনো স্থান আল্লাহর নূরের তাজাল্লীতে ভরপুর।
এসব স্থান আমাদের মনে করিয়ে দেয়—
একজন মানুষ থেকে শুরু হয়েছিল মানবতার চূড়ান্ত পথনির্দেশনা।
কল্যাণ, জ্ঞান, ন্যায় ও আলোর পথ—যা আজও আমাদের জীবনের দিশা।


কোন মন্তব্য নেই